বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেন বিশ্ব Ranking এ প্রথম সারিতে থাকে না?

শেয়ার করুন

সমস্যা বুঝতে পারা সমাধানের অর্ধেক। আমাদের সমস্যা কোথায়? এটা নিয়ে ব্যাক্তি অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলব।

সুস্থ্য পরিবেশ হল মেধা বিকাশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্যাস। আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলির সবথেকে বড় সমস্যা হল সুস্থ্য পরিবেশ নেই। কি সেই পরিবেশ

দেশের কোন এক সরকারী বিশ্ববিদ্যায়লে ছাত্র থাকা অবস্থায় আমাকে এক রুমে ৮ জন থাকতে হয়েছে। এক বেডে দুই জন করে। তবে বেড কিন্তু সিঙ্গেল। সেই সময় এটা সৌভাগ্য ছিল যে রুমে থাকতে পেরেছি। অধিকাংশ ছাত্রদের স্থান ছিল বারান্দায়। জ্বি। বারান্দায়। একটু বৃষ্টিতে তোষক ভিজে একাকার। কোন রকমে গুছিয়ে কাপড় বা পলিথিন দিয়ে তোষক ঢেকে রাখা লাগত।

রুমের পরিবেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল হলো ছারপোকা। লক্ষ কোটি ছারপোকা। শুরুতে ঘুমাতে কষ্ট হলেও আস্তে আস্তে অবস্থা ছিল এমন যে রক্ত চুষলেও টের পেতাম না।

শান্তিতে ঘুমানোর পরিবেশ ছিলনা সেখানে। তবে সবথেকে কষ্ট হত খাবারে। ক্যান্টিনে প্লেট বাটি নোঙড়া হয়ে পড়ে থাকত। বিড়াল ইদুরের মুখ দেয়া, তেলাপোকার ঘুরে বেড়ানো এগুলা ছিল খুব সাধারন ব্যাপার। শুরুতে কষ্ট হলেও এটাতেই মানিয়ে নিতে হয়েছে। কোন বিকল্প নেই। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট খাদ্যের মান যাচায় করতে কখনো যায়নি। যাবেওনা।

যখন তৃতীয় বর্ষে, তখন থেকেই খাওয়া দাওয়া বন্ধ। কখনো পাউরুটি, কলা, অথবা একটা নুডলস দোকান থেকে খেয়েই জীবন পার হয়েছে। ভার্সিটি জীবনের অধিকাংশ সময় অসুস্থতা খুব সাধারন ব্যাপার ছিল। ডাইরিয়া, গ্যাস্ট্রিক এগুলা খুব স্বাভাবিক। আজ এক যুগ পরেও পেটের সেই সমস্যা এখনো ভোগায়।

এই হল দশ টাকার ছা, ছামুছা, সিঙ্গারার গর্বের ইতিহাস। তবে এই ভিসি সেই সময় ছিলেন না।

সবথেকে কষ্টের যে জিনিসটির মুখোমুখি হতে হয়েছে সেটি হল গেস্টরুম সংস্কৃতি। রাজনৈতিক ছাত্র নেতাদের অত্যাচার, মারামারি এগুলা ছিল আতঙ্ক।

এত কিছুর ভীড়ে আমার মনে হয়না আপনি আশা করতে পারেন এমন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‍্যাংকিং এ প্রথম সারিতে থাকবে। যদি থাকে তবে সেটা র‍্যাংকিং এর অবমাননা করা হবে।

তবে শুনেছি এখন নাকি এসবের কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এবার আসি শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে। বাংলাদেশের মনে হয়না কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত মানা হয়। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দেশের বাজারে চাকুরীর জন্য উপযুক্ত চাহিদা থাকুক না থাকুক ডিপার্টমেন্ট খুলতে সমস্যা নেই।

যেই বিভাগ গুলি চালু আছে সেগুলার অবস্থা না ঠিক করেই নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। আর বিভাগ খোলার আগে কোন সমীক্ষা করা হয় কিনা আমার জানা নেই।

বাংলাদেশের দরকার দক্ষ জনশক্তি। আর এর জন্য দরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করা। কিন্তু কোন লক্ষ্য ছাড়াই এমন এমন বিভাগ খোলা হচ্ছে যেই বিভাগের ছাত্রদের জন্য হয়ত দেশে বিশেষায়িত কোন চাকুরীর বাজার নেই। আর এমন সব সাবজেক্টে আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে যে শুধু অধ্যাপনা বাদে হয়ত সেই বিষয়ের বিশেষায়িত কোন চাকুরীর বাজার আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। এতে ছাত্রদের ভেতর কি জমছে? হতাশা। হীনমন্যতা। অনিশ্চয়তা।

কিন্তু যেসব বিষয়ে দক্ষ জনবল দরকার সেরকম অনেক বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার কোন ব্যাবস্থা নেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলির এমন বিশৃঙ্খল ব্যাবস্থা ছাত্রদের উৎসাহিত করছে ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে বিসিএস নিয়ে পড়ে থাকতে। নষ্ট হচ্ছে মেধা।

ভাল ছাত্র সৃষ্টিতে ভাল শিক্ষকের বিকল্প নেই। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, সাদা দল, কালা দল, নীল, হলুদ, সবুজ শিক্ষকে ভরে যাচ্ছে ভার্সিটিগুলা অথচ এদের অনেকের যোগ্যতা নেই প্রাইমারিতে শিক্ষক হবার। কথাটা তিতা হলেও সত্য।

প্রতি ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা যদি ১০০ এর বেশি হয় তবে শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রদের সকলের খোজ রাখা সম্ভব হয়না। আর এটাই হচ্ছে আমাদের দেশে। অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড এর সাথে তুলনা করলে আগে এসব বিষয়ে নজর দেয়া উচিত।

গবেষনা? এটা হল আরেকটা আক্ষেপের বিষয়। প্লাগিয়ারিজম করে যেমন একেকজন পিএইচডি নিচ্ছেন ছাত্রদের ও উৎসাহিত করছেন ফাঁকি দেয়ার জন্য।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষনার বাজেট দেখে মনে হয় একটা বালিশের দাম ও হবেনা।

এরকম চরম বিশৃঙ্খলা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ গুলিতে থাকলে আপনি কিভাবে আশা করেন বিশ্ব র‍্যাংকিং এ যেতে পারব আমরা? প্রকাশনার জন্য শিক্ষকদের যেমন আগ্রহ নেই, ছাত্রদের আগ্রহী করার ও উদ্যোগ নেই।

এভাবেই চলছে।

আর এজন্যই আমি ব্যাক্তি অভিজ্ঞতা থেকে বলি, নিজেদেরকে পাবলিকিয়ান বলে মিথ্যা গর্ব করা বন্ধ করুন। কোন ভার্সিটি কোন ভার্সিটির থেকে বেটার এসব চাইল্ডিস কমপেয়ার করে নিজেকে লজ্জ্যায় ফেলার মানে নেই। এর থেকে উত্তম হবে উত্তমরুপে শিক্ষিত হওয়া। আর সেটা একমাত্র স্বশিক্ষিত হবার মাধ্যমে সম্ভব। ভার্সিটিতে পড়েন ভাল কথা। সার্টিফিকেট দরকার সেটাও বাস্তবতার জন্য মেনে নিলাম। কিন্তু নিজের দক্ষতা নিজে বৃদ্ধি করতে মনোনিবেশ করুন। আমাদের সময় ইন্টারনেট এতটা সহজলভ্য ছিলনা। তথ্য এতটা উন্মুক্ত ছিলনা। আপনাদের এই যুগে এখন যেকোন টপিকে ইউটিউবে সার্চ করলে অনেক সুন্দর সুন্দর ডেমো দেখতে পারবেন। সময় নষ্ট না করে নিজের উদ্যোগে নিজেই নিজের জানবার পরিধী বৃদ্ধি করুন। বিল গেটস এর সন্তান ও নাকি খান একাডেমি থেকে শিক্ষা লাভ করে।

মনে রাখবেন তথ্য প্রয্যক্তির এই যুগে ইন্টারনেট লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করেছে। একজন আমেরিকান যেসব তথ্য নেট থেকে পেতে পারে আপনিও সেটাই পেতে পারেন। এখন আপনাদের ভেতর পার্থ্যক্য গড়ে তুলবে নিজের ইচ্ছাশক্তি।

কাউকে আঘাত করে থাকলে দু:খিত। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি।

লিখেছেন: ওয়াসি মাহিন


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *